প্রফেসর উৎপল মণ্ডল

প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়

utpalnbu@yahoo.com

ভিডিও লেকচার

ভিডিও লেকচার ১

ভিডিও লেকচার ২

ভিডিও লেকচার ৩

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ ও লেকচার

২৩ মার্চ, ২০২৪

ভারতীয়ত্ব-রামকথা-সমকাল : গবেষণা পদ্ধতির নিরিখে

আরও পড়ুন →
১৫ মার্চ, ২০২৪

দারিদ্র্য : শৈবাল মিত্রের গল্পে

আরও পড়ুন →
১০ জুলাই, ২০২৩

ঔপনিবেশিক বাংলায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বিচ্যুতি : প্রসঙ্গ যাত্রা

আরও পড়ুন →
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

বর্তমানে বাংলা ভাষার সংকট ও উত্তরণ - ভাষা দিবসে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরও পড়ুন →
০৭ জানুয়ারি, ২০২৩

সমাজচিন্তক বিদ্যাসাগর: একুশ শতকের চোখে

আরও পড়ুন →
১৪ আগস্ট, ২০২২

অতুলপ্রসাদের গান: স্বদেশ ও স্বপ্ন

আরও পড়ুন →

গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার

  • "উনিশ শতকের নবজাগরণ, নারী ভাবনা ও বিদ্যাসাগর" - বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
  • বিধান চন্দ্র কলেজ, আসানসোল

Saturday, March 23, 2024

ভারতীয়ত্ব-রামকথা-সমকাল : গবেষণা পদ্ধতির নিরিখে

 


ভারতীয়ত্ব-রামকথা-সমকাল : গবেষণা পদ্ধতির নিরিখে

ড. উৎপল মণ্ডল 

প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 

utpalnbu@yahoo.com

✅ Lecture Link: https://youtu.be/cy4hylEV0o8

Friday, March 15, 2024

দারিদ্র্য : শৈবাল মিত্রের গল্পে

 







দারিদ্র্য : শৈবাল মিত্রের গল্পে 

ড. উৎপল মণ্ডল 
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 
utpalnbu@yahoo.com 

একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয় একই সঙ্গে ঘটে চলেছে সেই খণ্ড সময়ের বুকে। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বা অন্যান্য যাই হোক না কেন সেই বিষয়গুলি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতেই পারে, আবার নাও হতে পারে। আর সেই সময়ের বিষয়ের মধ্যে সমকালীন বা পরবর্তী কোনো চিন্তাশীল মানুষ ঠিক কোন বিষয়টাকে দেখবেন এবং কীভাবেই বা দেখবেন তা অবশ্যই ব্যক্তির মানসিকতার নির্ভরশীল। কিন্তু যদি এভাবে বলি যে— কোন বিষয় সেই ব্যক্তির চিন্তাকে প্রভাবিত করলো তাহলে বিষয়ের সত্যতা, গভীরতা এবং তার প্রকাশ্য প্রভৃতি দিকগুলিও গুরুত্ব পেয়ে যায়। 
‘দারিদ্র্য’ এদেশের সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই নতুন কিছু নয়। সেই চর্যাপদে ‘হাঁড়িত ভাত নাহি’ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ শেষ হয়েছে ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’-তে এসে। তারপর ব্রিটিশ আমলে তার মাত্রা আরো চড়ে শাসন-শোষণের কারণে। বিশেষত উত্তাল চল্লিশের সেই অমানবিক দিনগুলি বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখারই সাদা পাতাগুলি ভরিয়ে দিয়েছে কালো অক্ষরে। তাই স্বাধীনতার পর মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল— অন্যতর এক স্বপ্ন। 
কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এসে গেলেই তা দেশবাসীর মনে বহু প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। সমাজ-মনস্তত্ত্বের স্বাভাবিক নিয়মেই দেশবাসী স্বপ্ন দেখেছিল শোষণ-বঞ্চনাহীন একটি সোনালী দেশের । একটি সুখী দেশ আর সমৃদ্ধ জাতির স্বপ্ন। প্রায় গোটা পঞ্চাশ জুড়ে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়িত রূপ দেখার আগ্রহে ছিল দেশবাসী। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আসে স্বপ্নভঙ্গের হতাশা। প্রথম দুটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভারতীয় অর্থনীতি কোনো প্রভাব ফেলেনি, বলতে গেলে ব্যর্থই হয়। না কৃষি, না ভিন্ন কিছু কোনো কিছুরই উন্নতি হয়নি। মানুষের মধ্যে ঘনীভূত হতে থাকে হতাশা, বেদনা, ক্ষোভ— 
‘‘স্বাধীনতার দশ বছর যেতে না যেতেই সেই সব শূন্য গর্ভ, অলীক প্রতিশ্রুতির তকমা ফেলে দিয়ে ছিন্নমস্তা, রক্তভূক চেহারার দেশবরেণ্যরা নতুন বঙ্গভূমিতে হাজির হলো। কী ভয় দেখানো বীভৎস মূর্তি! ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ ধোঁকা খেয়ে অতল নৈরাশ্যে ডুবে গেল।’’ 
[‘সত্তর দশক’/তৃতীয় খণ্ড/ষাট-সত্তরের ছাত্র আন্দোলন/পৃ. ৩৪] অনিল আচার্য 
ছাত্র সমাজ তখন ব্যাপকভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বামপন্থী রাজনীতি ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে। আর পরিবার বড় হয়ে উঠলে তো ভাই-এ ভাই-এ মতবিরোধ স্বাভাবিক। পার্টির মধ্যেও নানা মত - ভাঙন – সে অন্য ইতিহাস। এই পরিস্থিতির মধ্যে একটি ভাবনা সঞ্চারিত হতে থাকে— ‘এ আজাদী ঝুটা হ্যায়’। 
দেশে তখন তীব্র সংকট খাদ্যের। সরকার এর মোকাবিলা করার চেষ্টা যে একেবারেই করেনি, তা নয়। সরকারি হিসেবে অনুযায়ী পনের লক্ষ টন চাল সংগ্রহ করে তার সঙ্গে পি.এল. ৪৮০ গম মিলিয়ে চেষ্টা চলেছিল এই সংকটের মোকাবিলা করার। কিন্তু ওই যে - পৃথিবীর উঁচু লোকেদের দাবী এসে সবই নেই - সব সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে! ফলত এ প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হয় না - খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টনের এই নীতি আপাতভাবে যতই বৈপ্লবিক মনে হোক, বড় চাষিদের থেকে লেভি নেওয়ার পরিকল্পনা যতই অভিনব মনে হোক, শেষ পর্যন্ত তাও আসলে হয়ে ওঠে প্রহসনেরই নামান্তর!
‘‘গ্রামাঞ্চলে বড় বড় জোরদারেরা সরকারি লেভির চাল ফাঁকি দিয়ে তা মজুত ও অধিক দামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা করতে লাগলো। আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষ রইল অর্ধাহারে, অনাহারে, লক্ষ্যমাত্রার এক তৃতীয়াংশ মাত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হল সরকার।’’ 
[‘লাল’ তমসুক, নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রামাণ্য তথ্য সংকলন’/গাঙচিল/পৃ. ৩৫] অমর ভট্টাচার্য 
শুরু হয় খাদ্য আন্দোলন। রাজনৈতিক কর্মীদের বিনা বিচারে গ্রেপ্তার। বসিরহাটে জনতা-পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষ। আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা পশ্চিমবঙ্গে। স্কুল-কলেজ নির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলেও, আন্দোলন চলে। কেননা এ তো শুধু খাদ্য আন্দোলনই নয়, একই সঙ্গে শাসক শ্রেণির প্রতি ক্ষিপ্ত সাধারণ মানুষের জেহাদ। 
জীবনধারার স্বাভাবিক নিয়মে একসময় স্তিমিত হয় আন্দোলন। সরকার রাজনৈতিক কারণে বন্দী এবং ছাত্র নেতাদের মুক্তি দেন ঠিকই, কিন্তু খাদ্য সমস্যার সমাধান হয় না। বলতে গেলে, সমস্ত দাবী প্রায় অমীমাংসিত থেকে যায়। 
এদিকে রাজনৈতিক মতাদর্শের চাপান-উতোর চলে। বামপন্থী নেতাদের বিভাজন ঘটে। এইসব ডামাডোলের মধ্যেও ১৯৬৭ সালে বামপন্থীদেরই এক অংশের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গে তরাই অঞ্চলে শুরু হয় সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন নকশাল আন্দোলন। স্বাধীনতা পরবর্তী দুই দশকে বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ হয়। হতাশা এবং সাধারণ মানুষের দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হওয়ার ইতিহাস আসলে নতুন ভাবে দেখা দিলেও তার মূল ভিত্তি ছিল সেই চিরাচরিত শোষণ। স্বাধীনতা পরবর্তী এই প্রথম কুড়ি বছর সম্পর্কে অরুণ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন— 
‘‘স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষ বিশ বছরেও (১৯৪৭-৬৭) স্বপ্নের আদর্শের ভারতবর্ষ হয়ে উঠতে পারেনি, যেতে পারেনি তার কাছাকাছি। গরীব আরো গরীব হয়েছে, ধনী আরো ধনী; ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার বজ্রমুষ্টির চাপে নিষ্পেষিত হয়েছে কোটি কোটি মানুষ, গ্রামাঞ্চলে মুষ্টিমেয় ধনী চাষি সব চাষযোগ্য জমির মালিক হয়েছে, আর শিল্প-বাণিজ্যের মালিক হয়েছে পঁচাত্তরটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।’’ 
[‘কালের প্রতিমা’/২০১০/পৃ. ২৭৮] 
সাধারণ বাঙালির ও বাংলার এই করুণ দুর্বিপাকের মধ্যেই শৈবাল মিত্রের বেড়ে ওঠা। ছাত্র জীবন ছাত্র রাজনীতি থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং একসময় রাজনীতি ছেড়ে লেখক হয়ে ওঠা, তবে তাঁর নিজস্ব মতাদর্শ থেকে বেরিয়ে আসেননি আমৃত্যু। তাঁর জীবন পর্যবেক্ষণ-অভিজ্ঞতা-সঞ্চয়-মনন-চিন্তন, এক কথায় মানসিক গঠন তৈরি হয়ে ওঠে এই সময়েই। 
সতের বছর বয়সে ১৯৬০ সালে স্কটিশচার্চ কলেজেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন শৈবাল মিত্র। তারপর ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৬৫ সালে ভারত রক্ষা আইনে কারারুদ্ধ হন এবং ১৯৬৬-তে খাদ্য আন্দোলনের পর মুক্তি পান। ১৯৬৭ সালে যখন কৃষক আন্দোলনের অভ্যুত্থান ঘটে তখন সামিল হন সেই আন্দোলনে যাকে তিনি যুব আন্দোলন বলেছেন। কৃষকদের দুর্দশা অনুভব করে তাদের মুক্তির জন্যই চারু মজুমদারের ডাকে তিনি ওই আত্মত্যাগের সংগ্রামে যুক্ত হন। কিন্তু যে সংবেদনশীলতার জন্য যোগদান, মনে হয় সেই সংবেদনশীলতার জন্যই, শ্রেণিশত্রু খতমের এই রাজনীতি যখন ব্যক্তিহত্যার রাজনীতিতে পরিণত হয় তখন রাজনীতির আঙিনা থেকে চলে যান প্রত্যক্ষভাবে। 
১৯৭৭-এই তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনীতি শেষ। যদিও এই আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন আজীবন। ৭৭-এর পর থেকে তিনি আশ্রয় নেন সাহিত্যে। বিক্ষুব্ধ এই সময়ের বুকে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করেছেন। শৈবাল মিত্র দরিদ্র কৃষকদের অমানবিক দারিদ্র্যকে অনুভব করেছেন বলেই তাঁর গল্পে বারবার উঠে আসে এইসব মানুষের কথা— সাধারণ বাঙালি কৃষকদের দারিদ্র্যের ছবি। ‘ক্ষুব্ধ স্বদেশ’, ‘আতর আলির রাজসজ্জা’ (১৯৮৩), ‘মা বলিয়া ডাক’ (১৯৮৭), ‘ঈশরো আল্লা’ (২০০৪) প্রভৃতি গ্রন্থ সে সাক্ষ্য দেয়। 
আর একটি কথা, শুধু গল্প নিয়ে নয়, শৈবাল মিত্রের উপন্যাস সম্পর্কেও তা সত্য— এইসব লেখনীগুলির নানান ডাইমেনশন আছে। নানান দৃষ্টিকোণ থেকে নানাভাবে আলোচনার দাবী রাখে তাঁর গল্প বা উপন্যাস সবই। এই প্রবন্ধে আমার অন্বেষণ শুধু দারিদ্র্যের কথা। এবং তাও শুধু গল্পগুলিকে কেন্দ্র করে। 
একটু আগেই আমরা দেখলাম— শৈবাল মিত্র ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সর্বহারাদের পক্ষে গিয়েছেন, রাজনীতির সূত্রেই দেখেছেন এদের আবার একটা সময় আদর্শ থেকে না সরলেও রাজনীতি থেকে সরে এসেছেন। তারপর? ঠিক তারপরই আশ্রয় নিয়েছেন সাহিত্যের কাছে। কেন এমন হল? শৈবাল মিত্র আরো অনেক কিছুই করেছেন— অধ্যাপনা করেছেন, তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। কিন্তু ১৯৭৭-এ রাজনীতি থেকে সরে এসে সাহিত্যই তাঁর মূল আশ্রয় বলে আমার মনে হয়েছে। কেন সাহিত্য, কেন এই লেখা সে সম্পর্কে তিনি নিজেই, সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কেন লিখি’-তে জানিয়েছিলেন যে পৃথিবী এবং মানুষের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়েই নাকি তাঁর কলম বিষোদ্গার করেছে— যদিও সে ক্রোধ আসলে ভালোবাসারই নামান্তর— বিকল্প ভালোবাসা। শুধু তাই নয়, আরো জানান যে কারো হিত বা অহিত করার জন্য নয়, তিনি লেখেন নিজের সঙ্গে নিজের মতো করে কথা বলতে। ঠিক এই পয়েন্টে আমি আসতে চাইছিলাম। এইবার আমরা দেখব কীভাবে তিনি অনুভব করেছেন রাজনীতিকে, মানুষকে, দারিদ্র্যকে। 
‘সংগ্রামপুর যাত্রা’ গল্পের পিছুরুদ্দি শামুকপোতা গ্রামের ভূমিহীন কৃষক। গল্পের নায়ক। হ্যাঁ, নায়কই বটে, কেননা পার্টির দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেল কমিটি তৈরি হবে তারই নেতৃত্বে। ক্ষেতমজুর আর ভূমিহীন কৃষকদের সংগঠন। কিন্তু এই রোগা লম্বা, তোবড়ানো গাল, কাঁচা-পাকা দাড়ি— যার নিজেরই ঠায় ঠিকানা নেই তেমনভাবে, নেই অন্নের সংস্থান, লেখাপড়ার অবস্থা তো কল্পনার অতীত— অভাবেরও ওপর দিয়ে যায়। তাহলে এই পিছুরুদ্দি কেন নেতৃত্বে?  
কারণ ভারতীয় বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় উত্তেজনার বীজ তখন ছড়িয়েছে গ্রামাঞ্চলে। গ্রামাঞ্চলে কৃষক সংগ্রামের ঝড় উঠেছে। সেটা তো বটেই। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা— 
‘‘শহুরে ভদ্রজন বুঝতে শুরু করেছে যে, গ্রামই হলো ভারতবর্ষের শ্রেণি সংগ্রামের মূল আখড়া এবং গ্রামের জোয়ারে শহর ভেসে যাবে।’’ 
[‘আতর আলির রাজসজ্জা’/‘সংগ্রামপুর যাত্রা’/কবিপত্র প্রকাশ/পৃ. ৪৯] 
আর তাই শহরের কমরেড অমিয়দার চোখে পিছুরুদ্দির মতো এমন ‘কমরেড’ আর হয় না। কারণ পিছুরুদ্দির গ্রামের অবস্থা এতই ভয়ংকর যে তা চিন্তাশীল পাঠককে মনে করিয়ে দেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘টিচার’ গল্পের কথা। 
কেমন সে ভয়ংকর অবস্থা? শৈবাল মিত্রের চোখ দিয়ে আমরাও দেখি। এই পিছুরুদ্দির মতো মানুষেরা একদিন দু’বেলা খেতে পারতো। কিন্তু এখন একেবারেই ‘ভূখা’ মানুষের শ্রেণিতে পরিণত। গোটা গ্রাম। তারা আজ সকলেই ভূমিহীন। আর গাঁয়ের এইসব মানুষেরা— যাদের ‘গাত্রবর্ণ থাকে না, ময়লা, গোলাপী লুঙ্গির উপর ততোধিক ময়লা ছেঁড়া হাফ হাতা গেঞ্জি’ —তারা শহরের ফর্সা মানুষদের বিশ্বাস করতে পারেনা। উচ্চবিত্তদের দ্বারা প্রতারিত হতে হতে বিশ্বাস ব্যাপারটাই তাদের উড়ে গেছে— সন্দেহ করা তাদের একটা বাই হয়েছে। তাহলে তো পিছুরুদ্দিকেই নেতৃত্বে আনা দরকার। তাই না? 
কিন্তু; এই শ্রেণি সম্পর্কে যে পাঠকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, যাঁরা এই শ্রেণি থেকে উঠেছেন কিংবা সরাসরি দেখেছেন— মানে অনুভব করেছেন এই অবস্থাকে, তাঁরা আমার সঙ্গে একটি বিষয়ে একমত হবে বলে আমার প্রত্যাশা। তা হল এই যে, এই তথাকথিত শহরে বাবুদের প্রতি তাঁদের যতই সন্দেহ হোক, কোথাও অবচেতনের কোনো গভীর তলদেশে একটা দুর্বলতাও থেকে যায়। মনের চরিত্রের এ এক অনির্দেশ্য রহস্য। তাই পিছুরুদ্দিও চায়— অমিয়দার মতো শহুরে নেতাকে গ্রামে নিয়ে যেতে। তাই, আমিয়দার মতো ‘প্রায়ই ঘি-ভাত খাওয়া’ লোকেদের গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য পিছুরুদ্দি দিনরাত বলে থাকে পার্টি অফিসে। যে ঘি-ভাতের সম্পর্কে লেখক কৌশলে জানিয়েছেন যে— দশ-বারো বছর বয়সে গ্রামের মহান চ্যাটাজ্জীর মেজো মেয়ের বিয়েতে এই পিছুরুদ্দি খিদের জ্বালায়, সকলের নজর এড়িয়ে হাঁড়ি ভর্তি ঘি-ভাত থেকে একটু খেতে গিয়ে ধরা পড়ে এবং শাস্তি হিসেবে তার চোখ গেলে দেওয়া হয়। সে কথা মনে পড়লে আজও তার মুখ কুঁচকে যায়— যন্ত্রণায়! তবু বলে থাকে পার্টি অফিসে। 
অথচ হরিহরদার মতো বড়লোকের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে সক্কলে গেলেও পিছুরুদ্দিকে কেউ ডাকে না। সারারাত উপোষ করেই থাকে পিছুরুদ্দি। হ্যাঁ, চরিত্রের শ্রেণিগত অবস্থানের সাপেক্ষে মনস্তত্ত্বগত এক ভিন্ন পাঠ হতেই পারে। কিন্তু, আমি সেদিকে যাচ্ছি না। কারণ, উপোষ করা পিছুরুদ্দির অভ্যাস আছে। গোটা পরিবারের অভ্যাস আছে। বংশানুক্রমে পিছুরুদ্দির বাপ-ঠাকুরদাও উপোষ করেছে— একথা যখন লেখক জানিয়েছেন তখন শ্রেণিগত মনস্তত্ত্বে চাপা পড়ে যায় বংশানুক্রমিক দারিদ্র্যের কাছে— যা আমার প্রতিপাদ্য। 
এ গল্পে দেখি, অবশেষে অমিয়দারা আসেন পিছুরুদ্দির গ্রামে— ‘শ্মশানের মতো’ গ্রামে। এসে দাঁড়ায়— ‘নাক নেই, চোখ নেই, স্রেফ চামড়া জড়ানো একটা হাড়ের’ দেহের সামনে। পিছুরুদ্দির মা! শেষ নয়, আরো আছে— পিছুরুদ্দির হাতের আলু, আটা আর ভেলিগুড় দেখে— 
‘‘খুশিতে আর আবেগে বুড়ির মুখের অদৃশ্য ঠোঁট, চোখ, কান, নাক স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে থাকলো। দাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে থাকা পিছুরুদ্দির সন্তানরাও খলবল করে উঠলো।’’ 
[‘সংগ্রামপুর যাত্রা’/সমগ্রন্থ/পৃ. ৫৭] 
‘মান্য মাইতির আইন অমান্য’ গল্পেও একইরকম অভাব ও দারিদ্র্যের কথা পাচ্ছি গল্পের ফাঁকে ফাঁকে, যদিও গল্পের শেষে গিয়ে বার্তা কিছুটা বদল হয়ে যায়— দুটি চরিত্রের অবস্থানগত পার্থক্যের মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং শেষ পর্যন্ত তার বিস্ফোরণ। খুবই গরীব মান্য মাইতি আইন অমান্য করার অপরাধে লকআপে থাকবে বলে ননীবাবুর সঙ্গে থানায় এসে বসে আছে। ননীবাবু বয়সে ছোট হলেও পার্টির ওপরতলার নেতা, আর মান্য মাইতি বয়স্ক হলেও সামান্য পার্টিকর্মী। কিন্তু লকআপে জায়গা নেই! তাই বড়বাবুর অপেক্ষায় বসে। খিদে আর ক্লান্তিতে চোখের পাতা বুজে আসে মান্যর। হাই ওঠে। খিদে তো পাবেই, এতটা পথ পায়ে হেঁটে এসেছে— যদিও উপোষী ছেলেমেয়ে আর বউয়ের সামনেই; ঘরে চলে বাড়ন্ত থাকলেও সে ভাত আর ডাল খেয়ে এসেছে। কেন খেয়েছে? এখানে একের পর এক বেরিয়ে আসে মান্যের অবস্থার কথা। দ্বিতীয় পক্ষের নতুন বউ বিমলার মুখের দিকে চেয়েই ভাত খেয়েছে মান্য— 
‘‘বাইশ বছরের যুবতীর তাজা বুকের আবেগের চেয়ে দারিদ্র্য বা পাকা চুল তো আর বেশি শক্তিশালী নয়। মান্য তাই হামলে পড়ে ডাল ভাত খেয়েছিল। আধপেটা চার ছেলেমেয়ে আর নতুন বৌ-এর কথা ভাবেনি।’’ 
[‘শ্রেষ্ঠ গল্প’/‘মান্য মাইতির আইন অমান্য’/দে’জ/১৯৯৯/পৃ. ৪৫] 
আগেই বলেছি, মনস্তাত্ত্বিক ঘাত-প্রতিঘাতও এ গল্পে একটা বড় দিক। এখানেও তা আসতেই পারে। কিন্তু তাতে মান্য মাইতিদের অমানবিক দারিদ্র্য সত্ত্বেও অন্য মানবিক গুণই ফুটে ওঠে। মান্যর দ্বিতীয় স্ত্রী বাইশ বছরের। কেন? আবার লেখকের কলমের দু-একটি আঁচড়ে উঠে আসে মান্যর অর্থনৈতিক অবস্থান। মান্যর প্রথম স্ত্রী লক্ষমণি মাঝরাতে বুক ধড়ফড় করে মারা যায়। আর তাতে মান্যর অনুতাপ খুব কম এজন্যই যে— মাঝরাতে মারা যাওয়ায় ডাক্তার বা ওষুধের খরচার হাত থেকে সে বেঁচে গেছে। সে সাধ্য তো মান্যর নেই। গরীব হওয়ার সুবাদে জীবনের নির্মম সত্যকে সে উপলব্ধি করেছে— ‘আর্থিক সাধ্য, সংগতি না থাকলে শুধু ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে বাঁচানো যায় না’। 
আরো মারাত্মক উপলব্ধি— জীবন জিজ্ঞাসার কথা উঠে আসে মান্যর চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে। মান্যর খিদে পায়— অস্থির হয়ে ওঠে; কিন্তু মান্য দেখে ননীলালের খিদে পায় না। ননীলাল শিক্ষিত, স্কুল মাস্টার। ওপর তলার নেতা, আর মান্য ক্যাডার, চাষা, মুখ্যু মানুষ। মান্য অবাক হয়, নানান কথা মনে হয় তার— 
‘‘লেখাপড়া জানা লোকেদের খুব একটা ক্ষিদে পায় না হয়তো বিদ্যের ভারে ক্ষিদে মরে যায়। মান্যর মনে তাই একটা আফশোষ আছে। লেখাপড়া শিখলে হয়তো এই ক্ষিদের হাত থেকে বেঁচে যেতো।’’ 
[ঐ, পৃ. ৪৩] 
কি বলবেন একে? উপলব্ধি, ব্যঙ্গ-শ্লেষ, নাকি খিদের জ্বালায় অশিক্ষিত সরল সাদা মানুষের খিদে-মুক্তির অভিলাষ চিন্তা! 
অর্থনৈতিক অবস্থা আর ইজ্জত রক্ষার দ্বন্দ্ব সাহিত্যের আসরে তেমন কোনো নতুন ইস্যু নয়। কিন্তু এই বিষয় নিয়েই শৈবাল মিত্রের ‘খয়ের খাঁর ইন্তেকাল’ গল্পটির গতিপ্রকৃতি ভালোভাবে লক্ষ করলে পাঠক চমকে উঠবেন, কোনো সন্দেহ নেই। ধন্বন্তরি পীর পয়গম্বর খয়ের খাঁ সাহেবের ইচ্ছানুযায়ী হোচেন খাঁ সাহেবের ইন্তেকালের কথা গ্রামের সবাইকে জানিয়ে দেয়। লোকসমাগম-খাওয়া দাওয়া উৎসবের পর্যায়ে। খয়ের খাঁ ওষুধে সেরে ওঠায় দাশু হালদারও এসেছে, যে দাশু হালদার একটু উচ্চশ্রেণির, মানে অর্থনৈতিক দিক থেকে। এই দাশুর সূত্রেই মূল গল্প। 
প্রায় ছ’মাস আগে চিনিবিবি আত্মহত্যা করেছিল যে চিনিবিবির স্বামী ইদ্রিশ মাঝি সুন্দরবনে কাঠ আনতে গিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেলে হোচেন তাকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চায়। হোচেন তাকে সত্যি ভালোবাসলেও চিনিবিবি নারীসুলভ লজ্জায় কিছুই বলে না— পেট চালানোর জন্য থানার বড়বাবু দাশু হালদারের ঢেঁকিশালে কাজ করে সে; প্রায় দেড় বছর। একসময় কাজটি চলে যায়। হোচেন তা জানতে পারে আমতলার হাটে এবং কাজ যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে লজ্জায় মাথার কাপড় সামলে চিনি জানায়— ‘কর্তা চায়। মুই বাজারে ঘর নে থাকি। তোমার সঙ্গে নিকের খবরে উনি চটেছেন’। চিনির শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে হোচেন একটি কাপড় কিনে দেয় তাকে। আর, সাতদিন পরেই নিকে করবে বলে গ্রাম ছেড়ে শহরের কলে কাজ করতে যায় হোচেন। 
ঠিক সাত দিন পরেই ফিরে হোচেন দেখে জয়ন্ত হালদারের পুকুর পাড়ের লিচু গাছে চিনিবিবির ঝুলন্ত দেহ। চারদিকে খবর রটে যায় চিনিবিবির পেটে নাকি বাচ্চা এবং তা হোচেনের। এক মাসের জন্য হাজতবাসও হয় হোচেনের। কিন্তু মুখ্যুসুখ্যু। হোচেন বুঝে পায় না এই আত্মহত্যার কারণ কি? 
পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গেছেন আত্মহত্যার কারণ! জনপ্রিয় গল্পকারের সুখপাঠ্য গল্পের প্রচলিত যে ফর্মুলা, তা অতি সহজেই সেই ইঙ্গিত দেয় আমাদের। কিন্তু না। তাহলে আমার প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোচনায় এ গল্প আসতো না! 
একমাস পরে জেল থেকে ফিরে হোচেন জানতে পারে, চিনিবিবির পেটে পাওয়া গিয়েছিল ‘শুধু আধসেদ্ধ কলমি শাক আর জল’। হ্যাঁ, ইজ্জত রক্ষা আর দারিদ্র্যের যুদ্ধ তো বটেই! ঢেঁকিশালের কাজটি তো সেজন্যই চলে যায়। হাসিমুখে দারিদ্র্যকেই বরণ করে নেয় চিনিবিবি। কিন্তু সে দারিদ্র্য এতই অমানবিক যে ‘খিদের জ্বালায়, পাঁচ দিন উপোষ করে সে গলায় দড়ি দেয়’। দারিদ্র্যের সেই অমানবিকতার সাক্ষ্য বহন করে হোচেনের দেওয়া সেই শাড়িটি, যা দু’টুকরো করে— অর্ধেকটা কোমরে জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করে, আর অর্ধেকটা দিয়ে গলায় ফাঁস দেয় চিনিবিবি! 
এইরকম অনেক গল্পেই শৈবাল মিত্র তুলে ধরেছেন এইসব অন্তেবাসী মানুষদের দারিদ্র্যের কথা। ‘কমলি তুই ঘরে যা’, ‘ইলিশের রাত’, ‘আতর আলির রাজসজ্জা’, ‘লাশ জেগে ওঠে’ প্রভৃতি আরো বহু গল্পেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে আসে স্বাধীনতা পরবর্তী নিম্নবিত্ত মানুষদের জীবনের কথা। 
‘আতর আলির রাজসজ্জা’-তে দেখা যাবে, এরা প্রায় তিন মাস মতো খাওয়া-দাওয়া পায়, স্বাস্থ্য ভালো থাকে। ঐ যখন ধান ওঠে আর কি। তারপর ‘শুকনো প্যাঁকাটি মার্কা’। চেহারা, বছরের বাকি সময়। তাই বলে কি এদের সখ-আহ্লাদ থাকতে নেই? মানুষ তো। তাই আতর আলিকে দেখি, ড্রেস এবং ডেকোরেটিং ব্যবস্থার মালিক— মেজোকত্তার কাছ থেকে ভাড়ার রাজপোষক নিয়ে বিয়ে করতে যেতে। 
তবে ‘লাশ জেগে ওঠে’ গল্পের তীব্রতা, আমার আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষিতে অনেক বেশি। মালোপাড়ার গল্প। চুরি-ডাকাতি, খুন-যখন, ছিনতাই-রাহাজানি প্রায় লেগেই থাকে। দাগী আসামী এবং দরিদ্র তো বটেই, - কালু মালো তার বউকে একদিন খুন করে ফেলে। এটা তেমন কিছু না, এজন্যই যে— ‘সংসারে ক্ষিদে অভাব থাকলে এরকম ঝগড়া, দু’একটা খুন হতেই পারে’। কিন্তু কালুর মতো দাগী আসামী খুব ক্যাজুয়ালি তা স্বীকারও করে। কালুর সত্যবাদীতায় আইনজীবীরা তাজ্জব বনে যায়। শুধু তাই নয় কালুর আইনজীবী কিছুতেই তাকে বলাতে পারে না যে সে খুন করেনি। ফলে কালুর যাবজ্জীবন জেল হয়। 
কেন এমন? কালুর আত্মগ্লানি? কর্মফল ভোগের মাধ্যমে অনুতপ্ত হৃদয়ের সান্ত্বনা খোঁজা? না, এসব নয়— 
‘‘জেলের ভেতর বুক চিতিয়ে কালু এমনভাবে হেঁটে চলে গল্প করে বেড়াতো সে, তাকে দেখে মনে হ’ত, সে কোন শৈল শহরে হাওয়া খেতে এসেছে। শরীরের রোগ ভোগ সেরে কালু সুস্থ হয়ে উঠলো, তার ওজনও হু হু করে বেড়ে গেল। রুগ্ন, ভাঙাচোরা শরীর কালুকে দেখে এতদিন আধবুড়ো বলে মনে হতো, এখন বোঝা গেল যে, সে চুয়াল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ বছরের তাজা তাগড়, ফুর্তিবাজ জোয়ান।’’ 
[‘জেগে ওঠে লাশ’/‘মা বলিয়া ডাক’/কবিপত্র প্রকাশন/১৯৮৭/পৃ. ৯৭] 
জেলখানার খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া কালুর জীবনধারণের আর কোনো পথ ছিল না। হ্যাঁ, সেরকম পরিবারেই কালুর জন্ম, অর্থাৎ এই অভাব যে পুরুষানুক্রমিক তাও জানা যায় অন্য বন্দীদের কাছে কালু যখন তার জীবনকথা বলে। কালুর মা ফুল্লরা একদিন গভীর জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে কালুর জন্ম দেয়। এবং সদ্যজাত শিশুকে গাছতলায় রেখে, আগে কাঠের বোঝাটি বাড়িতে রেখে আসে। কারণ— 
‘‘গাছতলায় ছেলেটাকে রেখে গেলে কেউ ছোঁবে না, কিন্তু এত বড় একটা কাঠের বোঝা বেওয়ারিশ পড়ে থাকলে নিশ্চয়ই লোপাট হয়ে যাবে। পেটের বাচ্চার চেয়ে মেহনতের কাঠ অনেক বেশী দামি।’’ 
[ঐ, পৃ. ৯৯] 
শৈবাল মিত্র লেখার জগতে এসেছিলেন রাজনীতি ছাড়ার পর, অর্থাৎ ১৯৭৭-এর পর। যদিও গল্পের সময় অর্থাৎ প্রেক্ষাপট কোন কোন ক্ষেত্রে ষাট দশক বা তারও পূর্ববর্তী। কিন্তু বেশির ভাগই আশি-নব্বইয়ের সময়ের গল্প। তখনও এত অভাব মানুষের। নিচুতলার মানুষের। লেখকের আবেগাশ্রিত ‘সাহিত্যের বাস্তব’ নয় তো! কেননা, ১৯৭৫ সালে তো ভারতবর্ষের রেকর্ড পরিমাণ শস্য উৎপাদন হয়েছিল। 
মনে রাখতে হবে তিনি আমৃত্যু মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী লেখক, যাঁরা কখনোই কলাকৈবল্যবাদে বিশ্বাসী নয়। আর রেকর্ড পরিমাণ শস্য উৎপাদন হলেও কেন এই অবস্থা দেশের, সে কৈফিয়ৎও তিনি দিয়েছেন এবং তা গল্পের মধ্যেই। ‘মা বলিয়া ডাক’ গল্পে এর চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যদিও গল্পটির আবেদন একেবারে ভিন্ন - পুলিশের অত্যাচার। 
এ গল্পে নক্কিরাণীর স্বামী গর্ভবতী নক্কিরাণীকে রেখে চলে যায় পাতাল রেল কাজ করতে। পাতাল রেল— মানে এই দুটো শব্দেই গল্পের সময়কাল চিহ্নিত। আর সংসারের অক্টোপাশে জর্জরিত নক্কির আলাপ হয়ে যায় চোরাচালানকারী গন্ধকালীর সঙ্গে, যে গন্ধকালীর প্রথম পক্ষের স্বামী আবার এই কাজ করতে গিয়েই পুলিশের হামলায় মৃত্যুবরণ করে। তারপর গন্ধকালী জগাই-এর রক্ষিতা, যে জগাই চোরাচালানের মূল পাণ্ডা। আর এই জগাই-এর সূত্রেই বেরিয়ে আসে রেকর্ড পরিমাণ শস্য উৎপাদন সত্ত্বেও কেন খাদ্যের এত অভাব— 
‘‘রেকর্ড খাদ্য উৎপাদন মানেই দেশজুড়িয়া রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য সংকট। অভাব, অনাহার, কালোবাজার এবং অজন্মা হইলেই খাদ্য সংকট কম হয়। কেননা, যাহারা কালো টাকার মালিক, অল্পস্বল্প উৎপাদন হইলে তাহারা টাকা লাগাইতে উৎসাহ বোধ করে না। বিপুল পরিমাণ কালো টাকাকে সক্রিয় রাখিতে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন এবং দেশজোড়া বাজারের দরকার হয়। জগাই বুঝিল, যে এ বৎসর তাহাদের রমরমা ব্যবসা হইবে।’’ 
[‘মা বলিয়া ডাক’/‘মা বলিয়া ডাক’/কবিপত্র/১৯৮৭/পৃ. ৫৪] 
তাহলে আর সন্দেহ থাকে না, এই অকল্পনীয় দারিদ্র্যের বাস্তবতা সম্পর্কে। উল্লেখ্য, মহাশ্বেতা দেবীও এই সময়েই লিখছেন, এই সময়ের কথাই লিখছেন এবং এদের কথাই লিখছেন। 
শুধু এই দারিদ্র্য আর এইসব অভাবগ্রস্ত মানুষের কথাই বলেননি শৈবাল মিত্র। এই অভাবী মানুষদের কীভাবে কাজে লাগায় রাজনৈতিক নেতারা এবং কাজ ফুরোলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়; সে কোথাও দেখিয়েছেন— যা এই একুশ শতকেও চোখ খোলা রাখলে আমরা দেখতে পাই প্রতিবার ভোটের সময়। এরকমই একটি মর্মান্তিক গল্প ‘ভোটার বৈরাগীচরণ’। 
দরিদ্র মানুষের খিদের জ্বালাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতার লড়াইয়ে জিততে চাওয়া রাজনৈতিক নেতারা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসে ভোটারদের। একশো দুই বছরের পঙ্গু ভোটার বৈরাগীচরণকেও তাই ডুলি করে নিয়ে আসে। যদিও অন্য একজনকে আনতে গিয়ে, তাকে না পেয়ে এই শতায়ু ভোটারকেই লুচি আর বোঁদে, খাওয়ানোর আশ্বাস দিয়ে নিয়ে আসে ভোটকেন্দ্রে। অথচ এই বৈরাগীচরণ— ভোট কি, তাই জানে না! এইসব অবহেলিত, অভুক্ত দুর্বল মানুষের হীনমন্যতার মনস্তত্ত্বকে ঠিক যেভাবে গ্যাসবেলুনে পরিণত করা হয় আজও, ঠিক সেই ভঙ্গিতে পার্টির চামচারা বোঝায় বৈরাগীকে— ‘ভোট একটা গণতান্ত্রিক অধিকার। কারা দেশ শাসন করবে। সেটা তুমি ঠিক করে দেবে’। 
তবে দরিদ্রের থেকেও দরিদ্র এই ভোটারের কাছে অবশ্য লুচি বোঁদেটাই বড় ব্যাপার। তাই ক্লান্ত অবস্থায় বৈরাগীচরণ ডুলির ভিতর বসে যখন পৌঁছয় ভোট-উৎসবের ভোজবাড়ি— বুথের কাছে, তার তন্দ্রাভাব কেটে যায়— 
‘‘ডুলির বাইরে ঘাড় বার করে মুগ্ধ, বিহ্বল চোখে জিলিপি আর বোঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। এতো জিলিপি! এতো বোঁদে! ভোঁতা হয়ে যাওয়া— ঘ্রাণেন্দ্রিয় দিয়ে একটা জোরালো নিঃশ্বাস টানে সে। পুরোনো এক স্বপ্ন আর স্মৃতিতে সে যেন বুঁদ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।’’ 
[‘ভোটার বৈরাগীচরণ’/‘শ্রেষ্ঠ গল্প’/‘দে’জ/১৯৯৯/পৃ. ৬৪] 
বৈরাগী তাই ভাবে, প্রতিবছর সে ভোট দিতে আসতে চায়, লুচি বোঁদে খেতে চায়। 
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটপুজোর সমাপ্তি হলে স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে বারবার হস্তান্তরিত হতে হতে বৈরাগীচরণকে আর লুচি বোঁদে খাওয়ানোর লোক পাওয়া যায় না; পৌঁছে দেওয়া তো অলীক স্বপ্ন। বটতলার বাঁধানো চাতালে ক্লান্ত অবসন্ন বৈরাগীকে শায়িত দেখে ভিখিরি মনে হয় ভোট গ্রহণ কর্মীদের। সবাই চলে যায়। আর খিদের জ্বালায় বৈরাগী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তবু— 
‘‘ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে বৈরাগীচরণ স্বপ্ন দেখছে, তার সামনে পেছনে লুচি বোঁদের পাহাড়। হাওয়ায় ভুর ভুর করছে লুচি বোঁদের গন্ধ। বৈরাগীচরণ জানেনা, একপাল উপোষী শিয়াল ধীরে ধীরে তার পায়ের দিকে এগিয়ে আসছে।’’ 
[ঐ, পৃ. ৭০] 
স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষে একজন শিক্ষিত এবং অনুভূতিশীল তরুণের স্বপ্ন— যেমন হবার কথা, হয়েও ছিল আমাদের বাংলায় হাজার হাজার তরুণের; শৈবাল মিত্রের ক্ষেত্রেও তাই সত্য। স্কুল জীবন থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যা দিয়েও তাই রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে ছুটেছেন গ্রাম-গ্রামান্তরে স্বপ্ন দেখেছেন এক উন্নত ভারতের। নিজেই জানান— 
‘‘জোড়াতালি দেওয়া হৃদযন্ত্র নিয়ে উত্তাল সময়ের কর্মসূচিতে নেমে পড়লাম। …মুক্তির দশক তৈরির কাজে যতটা সম্ভব ডুবে থেকেছি। পৃথিবী জোড়া যুববিদ্রোহের সঙ্গে নিজেকে সংলগ্ন করতে চেয়েছি।’’ 
[‘শৈবাল মিত্র- ‘আজ আছি’/আরুণি পাবলিকেশন/২০০৩/পৃ. ৮৩] 
কিন্তু সেসব যখন আর হয়নি, হওয়া সম্ভব নয় বুঝেছেন তখন তিনি আশ্রয় নেন লেখার মধ্যে। আর আগেই একবার বলেছি যে পৃথিবী এবং মানুষের প্রতি এক ক্রোধ— যা আসলে বিকল্প ভালোবাসা, তাই-ই গতিদান করেছে তাঁর কলমকে। আবার ‘কেন লিখি’ থেকে একথা জানা যায় যে তিনি কারো হিত বা অহিত করার জন্য নয়, লেখেন নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য। মানুষের প্রতি এই ‘ক্রোধ/বিকল্প ভালবাসা’-ই দারিদ্র্যের নগ্নচিত্রকে তুলে এনেছে তাঁর গল্পে। আর যে স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন, তা তো পূরণ হয়নি আজও! সেই জন্যই লেখালেখি তাঁর নিজের সঙ্গে নিজের মতো করে কথা। তবে তা একই হয়ে ওঠে আমাদেরও কথা— আমাদেরও নিজের সঙ্গে কথা।

............…………..

Monday, July 10, 2023

ঔপনিবেশিক বাংলায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বিচ্যুতি : প্রসঙ্গ যাত্রা | Prof. Utpal Mandal

 


ঔপনিবেশিক বাংলায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বিচ্যুতি : প্রসঙ্গ যাত্রা | Prof. Utpal Mandal

Prof. Utpal Mandal Website: www.utpalmandal.in Email: utpalnbu@yahoo.com

✅ Lecture Link: https://youtu.be/2IGCBwHHsto

Monday, February 20, 2023

বর্তমানে বাংলা ভাষার সংকট ও উত্তরণ - ভাষা দিবসে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি

 



বর্তমানে বাংলা ভাষার সংকট ও উত্তরণ 

ড. উৎপল মণ্ডল 
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 
utpalnbu@yahoo.com 

       ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সংগঠিত গণআন্দোলন। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে  উর্দু। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দাবি ওঠে, বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। সেই প্রেক্ষিতে আমাদের একথা স্বীকার করতেই হবে যে, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দিয়েছে তা মূলত এসেছে বাংলাদেশের হাত ধরেই। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যের খাতিরে আমাদের একথাও স্বীকার করতেই হবে যে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মানভূমে ১৯১২ সালে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ে মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে। মানভূমের এই ভাষা আন্দোলন পৃথিবীতে একটি দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন। ১৯৫৬ সালের আগে পুরুলিয়া জেলা বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সময় রাজনৈতিক ভাবে বিহারের স্কুল-কলেজ-সরকারি দপ্তরে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে বাংলাভাষী জনগণ হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার চেষ্টা করে; কিন্তু, বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার, শরৎচন্দ্র সেন এবং গুণেন্দ্রনাথ রায় জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক দল ‘লোকসেবক সঙ্ঘ’ গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে তাদের সুদৃঢ় আন্দোলন করেন। ১৯৫৬ সালের এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে মে মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত এক বৃহৎ পদযাত্রার আয়োজন করা হয়, যা শুরু হয়েছিল পুরুলিয়ার পাকবিররা গ্রাম থেকে, এবং তার লক্ষ্যস্থল ছিল কলকাতা। এরপর ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার মানভূম জেলা ভেঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সঙ্গে একটি নতুন জেলা যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলা নামে পরিচিত তাকে সংযুক্ত করতে বাধ্য হন। এই প্রসঙ্গে আসামের ভাষা আন্দোলনের কথাকে ছেড়ে দিলে চলে না। আসামের বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল আসাম সরকারের অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেহেতু ঐ অঞ্চলের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলাভাষী। এই গণ আন্দোলনের প্রধান উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ১৯৬১ সালের ১৯মে ঘটে, সেদিন ১১ জন প্রতিবাদীকে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে আসাম প্রাদেশিক পুলিশ গুলি করে হত্যা করে, যার মধ্যে একজন নিতান্ত বালিকা - কমলা ভট্টাচার্য। প্রথম নারী ভাষা শহীদ এবং তা বাংলা ভাষার জন্য।

       বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাথে বাকি দুটি আন্দোলনের কথা এ ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক কারণ, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার জন্য তিন তিনবার আন্দোলন হয়েছে এবং খুবই গর্বের বিষয় প্রত্যেকবার সে আন্দোলনে জয়ীও হয়েছে। এটাই আমাদের বাংলা ভাষার সুবিশাল ইতিহাস। কিন্তু খুবই দুঃখের সাথে লক্ষ করা যায় এই ঐতিহ্যময় বাংলা ভাষার চারপাশে ঘনিয়ে এসেছে সংকটের ঘন ছায়া। এবার প্রশ্ন হল, এই সংকটটি কতটা গভীর? আদৌ কি আমরা বাংলা ভাষাকে সংকটের পর্যায়ে ফেলতে পারি? একটু ভেবে দেখলে উপলব্ধি করা যাবে, আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে যদি আমরা ফিরে যাই, তখন কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এতখানি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে পালিত হতো না। কিন্তু বর্তমানে আমরা বাঙালিরা রীতিমতো উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই দিনটিকে পালন করে চলেছি। দেখুন, একটি বিষয় তখনই ‘উদ্দেশ্য’ হয়ে ওঠে যখন তার নিখুঁত ‘প্রয়োজন’ জন্মায়। আমরা হেলথ চেকআপ তখনই করাতে যাই, যখন আমাদের শরীর কিছু ভুলের সংকেত দেয়। একই কথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের ক্ষেত্রে ও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা পালন করছি, কারণ পালন করবার প্রয়োজন পড়েছে, মানে অসুখ করেছে। হয়তো অসুখটি এখনো গুরুতর নয়, তবে অসুখ হয়েছে। আর সেটা যে হয়েছে ইউনেস্কো বর্ণিত তথ্য তা প্রমাণিত করে দেয়, তবে শুধুই যে সেটা বাংলা ভাষার জন্য প্রযোজ্য এমনটা নয়। পৃথিবীর  এমন অনেক ভাষাই  রয়েছে যা নিত্যদিন বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। যাকে আমরা বলি “Endangered language”। হ্যাঁ, বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। তা সত্ত্বেও ইউনেস্কোর একটি রিপোর্ট বলছে যে, প্রতি ১২ দিনে পৃথিবীতে একটি করে ভাষার মৃত্যু ঘটে, তার মানে এটা তো স্বীকার করতেই হবে যে প্রতিদিন কোনো-না-কোনো জননী মৃত্যুবরণ করে চলেছেন এবং সেই হিসেব অনুযায়ী জার্মানির একটি গবেষণা সংস্থা জানাচ্ছে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে এই ২৫ কোটি সন্তানের জননী একেবারে মৃত্যুবরণ না করলেও তাকে যেতে হবে বৃদ্ধাশ্রমের নিঃসঙ্গতায়। এবার প্রশ্ন হল বিষয়টি কি আদৌ সেই রকম? এখানেই আমার মূল আলোচনার জায়গাটি। পৃথিবীর যে কোন সহৃদয়বান, অনুভূতিশীল, চিন্তাশীল ব্যক্তি প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হন। তা যদি না হতো তাহলে ভবানীপ্রসাদ মজুমদারকে কেন লিখতে হয়, 'জানেন দাদা আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না' !

এবার এই সংকটের চিত্রটিকে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, আমার মতে চারটি পর্যায়ক্রমে অবশ্যই ভাবা দরকার-

(১) বাংলা ভাষার অধিকার।

(২) বাংলা ভাষার ক্ষমতা।

(৩) বাংলা ভাষার বর্তমান পরিস্থিতি।

(৪) বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়। 

       অধিকারের কথা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয়, হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধপূর্ণ ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে। যদিওবা স্বাধীনতার পরে তার ধরনটা একটু বদলে যায়। আমাদের যে এই দুই বাংলা ভাষার দেশ একদিকে ভারতের ক্ষুদ্রতম অংশ পশ্চিমবঙ্গে এবং অন্যদিকে বাংলাদেশে, যদিও বাংলাদেশ নিজেকে বাংলা ভাষায় সাবলীল করে তুলতে পেরেছে, কিন্তু ভারতবর্ষের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি এবং তার কারণও রয়েছে বটে, ভারতবর্ষ একটি বিভিন্ন ভাষাভাষীর দেশ, সেখানে কেবলমাত্র একটি ভাষা কে নিয়ে চলা রাষ্ট্রীয় পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভব নয়।  কিন্তু আমার প্রশ্নটা হল, রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিটা যদি আমরা ছেড়েও দিই তবুও আমাদের যেটুকু অধিকার বা ক্ষমতা রয়েছে বাংলা ভাষাকে অক্ষত রাখবার, সে সম্পর্কে কি আমরা খুব সচেতন? প্রশ্নটা এখানেই। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের দৈনন্দিন কাজ গুলো যেমন নানা ধরনের ফর্ম ফিলাপ, নানা ধরনের আবেদন পত্র লিখন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের পরিচয় জ্ঞাপন এই কাজগুলো আমরা ইচ্ছে করলেই মাতৃভাষায় করতে সক্ষম, সরকার তার সুবিধাও দেয় বটে। কিন্তু তবুও বাঙালি সেখানে মাতৃভাষার বদলে ইংরেজিকেই বেছে নেয়। তাই বলে কি ইংরেজিতে লেখা উচিত নয়? অন্য কোন পথ না থাকলে অবশ্যই ইংরেজিতে লেখা উচিত এবং তারসাথে নিজের বাংলা ভাষার যতটুকু অধিকার খাটানো যেতে পারে সেই জায়গাটুকু অবশ্যই ব্যবহার করা দরকার। আর এই প্রসঙ্গে উঠে আসে আত্মসমালোচনা। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে। আমরা বাংলাভাষার সংকট বলছি কিন্তু সেই সংকট আমাদের অধিকারগুলোকে না বোঝার ফলে কতটা উঠে আসছে, সেই জায়গাগুলো আমাদের ধরতে হবে।

       এরপর আসি আমার দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায়- বাংলা ভাষার ক্ষমতা। দেখুন, বাংলা ভাষার এই ক্ষমতাটুকু তো আছে যে, মাতৃভাষার আঁচল ধরে আমাদের যাবতীয় বক্তব্য বাংলায় বলতে পারি, লিখতে পারি, প্রকাশও করতে পারি। সেই ক্ষমতা যদি নাই থাকতো তাহলে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের বুকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ তৈরি করেছিলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, মহেন্দ্রলাল বসু, অমৃতলাল বসু বাংলায় লিখেছেন। অমৃতলাল বসু বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন ১৯১৪ সালে। সেই সময় ‘পথ’ বলে একটি পত্রিকা বার হতো যার সম্পাদকমন্ডলী তে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। সত্যচরণ লাহার আরেকটি পত্রিকায় সেসময় চলচ্চিত্র এবং বেতার এর টেকনোলজি বিষয়ে একের পর এক লেখা বেরিয়েছে। প্রকৃতি নিয়ে এখনকার সময়ে আমরা নানা রকম চর্চায় আবদ্ধ হয়েছি সেই সময় ‘প্রকৃতি’ নামেই জগৎ লাহা বাংলায় লেখা পত্রিকা বের করতেন। অথচ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পাওয়ার পর লক্ষ্য করা যায় এর উল্টো চিত্র। এবং এই একুশ শতকে এসে মানুষের ব্যস্ততা এবং চিন্তা করার শক্তি যত কমছে তত এই বিপরীত প্রবণতা বাড়ছে। তবে তা অবশ্যই হীনমন্যতার সাক্ষ্য বাহী। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি, আমি বহু বন্ধুবান্ধবকে জানি যারা সত্যিই অন্য ভাষায় পারদর্শী, এমনকি এই সময়েও যারা অধিকাংশ সময় বাংলা বা ভারতের বাইরেই থাকে, তারা কিন্তু বাংলায় এসে অকারনে একটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে না! অধিকাংশ হীনমন্য বাঙালি আজ ভুলে যায় যে মধুসূদন দত্ত, উৎপল দত্ত, সত্যজিৎ রায় বাংলাতেই লিখেছেন। আসলে চিন্তার দৈন্যতাই এই হীনমন্যতার অন্যতম কারণ। বর্তমানে কলোনিয়াল হ্যাংওভার গ্রস্থ বহু বাঙালির এই অবস্থা। হীনমন্যতায় ভোগা কিছু বাঙালির এই মানসিকতার পরিচয় একটু আধটু পাওয়া যায় আগেও। তা না হলে একশ বছর পূর্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ খোলার সময় তৎকালীন উপাচার্য মহাশয় কে অত কথা শুনতে হতো না! এবং আরো মজার ব্যাপার, বাংলার ছাত্র দের যে প্রথম ব্যাচটি বেরিয়েছিল, তাদের আবার বাংলা পরীক্ষা দিতে হয়েছিল ইংরেজি ভাষায়! অর্থাৎ বাঙালির এ রোগ বহু পুরনো, এবং পরিবেশগত কারণে সে রোগ এখন মহামারি’র দিকে এগোচ্ছে।

       এবার আসি আমার আলোচনার তৃতীয় পর্যায়ে- বাংলা ভাষার বর্তমান পরিস্থিতি। বাঙালির  এইযে রোগ যা মহামারীর আকার ধারণ করেছে তার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। একটু বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বোঝা যাবে, বাংলা ভাষাটা ধারণক্ষমতা অনেকটাই বেশি। ইংরেজি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনেক শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। এই ‘Assimilation’ প্রক্রিয়া ততক্ষণই ভালো যতক্ষণ সেটা জোরপূর্বক হচ্ছে না। এখানে জোরপূর্বক বলতে ‘মানসিক আগ্রাসন’ প্রক্রিয়াটাকে আমি বোঝাতে চাইছি। এটির একটি ভালো উদাহরণ হল, ব্রিটিশরা যখন আমাদের দেশে মূলত ব্যবসা বাণিজ্য সূত্রপাত করে এবং আস্তে আস্তে তারা আমাদের দেশকে অধিকার করা শুরু করে এবং তারপরে চলে মানসিক আগ্রাসন। যাকে আমরা ‘Colonialism’ বলতে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে তারা ‘white supremacy’-কে প্রচার করা শুরু করে। অর্থাৎ ইংরেজরা যে ভাষায় কথা বলে যা তাদের আচার-আচরণ যাবতীয় কিছু যা কিছু তারা দৈনন্দিন জীবনে ব্যাবহার করে থাকে তা সবকিছু ভালো, আর সেটা ব্যতীত যাবতীয় কিছু খারাপ। এই ধারণা তারা মুলত নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল বশ্যতা স্বীকার করাবার জন্য, আর আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা শিল্পবিপ্লব উত্তর যুগের কথা, তখন তারা এসেছিল বাণিজ্য করতে। কিন্তু এখন সেটা বাণিজ্য পর্ব নয় এখন তার চুড়ান্ত বিকাশ পর্ব ‘Consumerism’ বা ‘পণ্য সভ্যতা’ চলছে এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছে ‘বিশ্বায়ন’। ফলে যে ভাষা যত বেশি অন্য ভাষার বাহকদের হীনম্মন্যতাবোধে ভোগাতে পারবে, ততটাই বেশি পরিমাণে নিজের মানসিক আগ্রাসনের রাজত্বকে, সংস্কৃতির রাজত্বকে বিস্তার যেমন করতে পারবে, তেমনি নিজেদের দেশীয় পণ্য কে বিক্রিয়ও করতে পারবে বেশি। যে কারণেই নানা ফোরস্টার, ফাইভস্টার রেস্টুরেন্টে খুব নিম্নমানের খাবারও উচ্চমানের ইংরেজি বাচনভঙ্গিতে বিক্রি করা হয়। তাই বলে কি নিজের ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানা উচিত নয়? অবশ্যই উচিত। যত বেশি ভাষা জানা থাকে, ততটাই বেশি জ্ঞানের পরিধিও বাড়তে বাধ্য। কিন্তু সেক্ষেত্রে শর্ত একটাই, নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে অন্য ভাষার ‘supremacy’-কে স্বীকার করে নেওয়া, এই মানসিক প্রবৃত্তির বিকাশে কখনোই সহমত থাকা উচিত নয়। এখানে জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটি লাইন খুব মনে পড়ে যাচ্ছে, যার দ্বারা বাঙালির মানসিক পরিস্থিতির কথা খুব সহজে বোঝানো যায়-

“অপরের মুখ ম্লান ক’রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই।”

                 ‘এই সব দিনরাত্রি’

                   জীবনানন্দ দাশ

       আর এখানেই চন্দ্রিল ভট্টাচার্য কে উন্মোচিত করে দিতে হয় হীনমন্য বাঙালির এক অদ্ভুত আত্ম সুখের মনস্তত্ত্ব - দুজন বাঙালি, আর অন্যান্য বাঙালির সামনে ইংরেজীতে কথা বলতে পারলে যে সুখ পায় তা আর কোথাও পায় না! এই প্রেক্ষিতেই ভাবতে হবে বাংলা ভাষার বর্তমান সংকট কে। এবার আসি  মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের বাস্তব প্রেক্ষিতে। দেখুন, একটি প্রশ্ন আমার মনের সর্বদা বিচরণ করে, আচ্ছা এই যে আগ্রাসনী মনোবৃত্তি পৃথিবীতে কার নেই? যে কোন দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, গোষ্ঠী  এবং একদম ক্ষুদ্রতম এককে যদি আমরা চলে যাই তাহলে দেখা যাবে প্রতিটি মানুষ ক্রমশ আগ্রাসন মনোবৃত্তি প্রতিফলিত করছে। এমনকি যেসব পাঠকেরা আপনারা যারা আমার লেখাটি পড়ছেন, তাদের প্রতি আমার বক্তব্যকে আমি যে চাপিয়ে দিচ্ছি না সে কথা কেউ বলতে পারবে? এই মনোবৃত্তি মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি এটি আজীবন ছিল ভবিষ্যতেও থাকবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারছি কারোরই এখানে কোন দোষ নেই, সবটাই নিহিত আছে আত্ম চেষ্টার উপরে। কে কতটা নিজেকে বশ হতে দিচ্ছে, আর কে তার অধিকার কে টিকিয়ে রাখতে পারছে এর মধ্যেই সমস্ত খেলাটি ঘূর্ণায়মান।

       প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলে রাখা দরকার, আমরা প্রায়ই এই মানসিক আগ্রাসন মনোবৃত্তিটাকে  বিশ্বায়নের মারফত ন্যায়সংযত করে তুলতে চাই। কিন্তু এখানে বলে রাখা দরকার ‘Globalization’ বা ‘বিশ্বায়ন’ এখন অতীত। এখন গ্লোবালাইজেশন পার করে আমরা পৌঁছে গেছি গ্লোলোকালাইজেশনে। যদি আমরা আমাদের আত্মশক্তিকে অক্ষত রাখতে পারি তাহলে পৃথিবীর কাছে আমাদের পৌঁছে যেতে হবেনা, পৃথিবীই আমাদের কাছে আসবে। এবার আমরা একদম আলোচনা শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি, আমরা এতক্ষন নানা সংকট, সংকটের প্রভাব, সংকটের ধরন এবং মানসিক আগ্রাসন রীতির নানা দিক আলোচনা করলাম। তাহলে প্রশ্ন হল এই সঙ্কট থেকে কোনদিন কি আমরা বেরোতে পারবো না? যদি পারি তাহলে তার রূপটা কি রকম হবে? আমার মতে একমাত্র ত্রিশক্তি ভাবনার দ্বারাই আমরা এই সংকটের মোকাবিলা করতে পারি।  ত্রিশক্তি বলতে মূলত তিনটি শক্তির মিলিত রূপকে বোঝাতে চেয়েছি। সেই শক্তি গুলি হল-

(ক) আত্মশক্তি

(খ) যৌথ শক্তি

(গ) চিন্তাশক্তি

       প্রথম কথা হল বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে আমাদের মধ্যে আত্ম শক্তির জাগরণ  ভীষণভাবে দরকার। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কাছে আবার ফিরে যেতে হয়-

“যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,

যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে ;

যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে

পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে ;

দেবতা বিমুখ তারে, কেহ নাহি সহায় তাহার,

মুখে করে আস্ফালন, জানে সে হীনতা আপনার

মনে মনে।”

                                    “এবার ফিরাও মোরে”

                                       রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

       এখানে আমাদের মনে সেই আত্মশক্তি টাকে জাগ্রত করতে হবে। আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে অন্যের ভিন্ন ভাষার বাচনিক ক্ষমতা দেখে, আমরা কেন নিজেদেরকে হীনমন্যতায় ডোবাবো? আমরা যদি একটু সচেতন ভাবে দেখি জাপান, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি দেশগুলো তারা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষার জোরে পুরো পৃথিবীর সামনে নিজেদেরকে প্রমাণিত করতে পেরেছে, তারা কখনোই আত্মগ্লানিকে উন্নতির মাঝে আসতে দেয়নি। একেই আমি বলছি আত্মশক্তির জাগরণ।

       এবার আসি যৌথ শক্তির প্রসঙ্গে। এখানেই হয়তো বাঙালি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বাঙালি এখন যৌথ হতে পারছে না। আমরা তথাকথিতভাবে ‘উন্নত’ শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করি। আমরা সদা ব্যস্ত এটা দেখানোর জন্যই যে, কে কার থেকে বেশি উন্নত। কিন্তু একটু গভীর ভাবে দেখলে লক্ষ করা যায় বাঙালি এযাবত যত উন্নতির পথে হেঁটেছে ততোবারই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা সর্বদাই দেখতে পারি, কোন ব্যক্তি বাংলায় বক্তৃতা দিচ্ছেন এবং অপর আরেকজন ব্যক্তি যদি তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন, সেখানে ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়া ব্যক্তিটি বাংলায় বক্তৃতা দেওয়া ব্যক্তিটিকে নিছক অবহেলা ছাড়া আর কোন চোখে দেখতে পারেন না। এই অবহেলার প্রশ্ন কখনোই আসা উচিত নয়। এখানে আমরা যদি একত্রিত হয়ে আমাদের নিজের মাতৃভাষাকেই বক্তব্যের মাধ্যম হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাই, তবেই যৌথ শক্তি সার্থক। দেখুন, সংকট যেহেতু একদিনেই আসেনি, ফলে তার সমাধান একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। এখানে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং যৌথ শক্তিকে প্রাধান্যতা দিতে হবে।

       এবার এই প্রসঙ্গেই চলে আসে চিন্তাশক্তির কথা। এই শক্তিটি একদম আমার বিশ্বাসের জায়গা। বর্তমান যুগে আমরা সারা পৃথিবীর প্রেক্ষিতে যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখা যাবে কিভাবে মানুষের চিন্তাশক্তিকে বিনষ্ট করে দেওয়া যায় তা নিয়েই চলছে মহাযজ্ঞ। মানুষের চিন্তা করতে  শিখলেই সে প্রশ্ন করা শুরু করে, আর সেই প্রশ্নই মানুষকে নেশাগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করে। আমরা যদি আমাদের মাতৃভাষাকে ভালোবেসে আমাদের চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করতে পারি তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তি পারবেনা আমাদের পিছিয়ে রাখতে। গ্লোলোকালাইজেশন এটার একটি ভাল দিক। এর উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ কে ছেড়ে দিলেও সাম্প্রতিক অতীতের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব সত্যজিৎ রায় বা উৎপল দত্ত কে। সত্যজিৎ অস্কার জয়ী হয়েছেন বাংলাতেই সিনেমা করে। চিত্রকর যামিনী রায় বা ভাস্কর রামকিঙ্কর ইংরেজি কেন বাংলা ছাড়া আর কোন ভাষায় জানতেন না। কিন্তু তাদের চিন্তার উৎকর্ষের জন্যই তাদের শিল্প পৌঁছে গেছে বিশ্বের দরবারে। যামিনী রায়কে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবার জন্যই বিষ্ণু দের মতন পন্ডিত তার শিল্পকর্ম নিয়ে ইংরেজিতে প্রবন্ধ লেখেন। অর্থাৎ কোয়ালিটিই আসল কথা। আর এই কোয়ালিটি ঠিক রাখতে মাতৃভাষার মাধ্যমে চিন্তাই একমাত্র সহায়ক। তার কারণ আগেই বলেছি। সত্যজিতের ছবিতে গুপী-বাঘা কে বলতে শুনি-- সাদাসিধা মানুষ মোরা দেশে দেশে যাই/ নিজের ভাষা ভিন্ন মোদের ভাষা জানা নাই। লক্ষ্য করার বিষয়, তারা বলছে, নিজের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানে না কিন্তু সেই ভাষা নিয়েই পৌঁছে গেছে রাজদরবারে! এটাই কোয়ালিটি।

       এই কোয়ালিটিটাকে আমাদের অক্ষত রাখতে হবে। আর এটা যদি আমরা অক্ষত রাখতে পারি তাহলে একশ কেন এক হাজার বছরেও আমাদের মাতৃভাষার সার্বিক দিক ঠিক থাকবে। হ্যাঁ, অবশ্যই কিছুটা বিবর্তিত হবে আর সেটা স্বীকার্য। কারণ বিবর্তন ছাড়া মানব জীবনের ইতিহাস কখনোই গড়ে উঠতে পারে না। সেই গুহা থেকে কম্পিউটার পর্যন্ত এটাতো বিবর্তনই, তাকে মেনে নিতেই হবে। কিন্তু  চিন্তাশক্তিতে ক্ষমতা থাকলে আমরা কখনোই অবলুপ্তির পথে যাব না, এটা আমার বিশ্বাসের জায়গা। এই ত্রিশক্তি আত্মশক্তি, যৌথ শক্তি এবং চিন্তাশক্তি কে মিলিয়ে আমাদের কয়েকশো বছর পুরনো বৃদ্ধা ভাষা জননীকে রক্ষা করতে পারবো, নতুবা একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে, নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে দিয়ে নিজের মাতৃভাষাকে সংকটের মুখে ঠেলে দেবো আমরা নিজেরাই। আত্মবিস্মৃত বাঙালির এই ত্রিশক্তিবোধ জাগ্রত না হলে বছরের পর বছর তৈরি হবে শুধু হাঁসজারু। আর যে মায়ের পঁচিশ কোটি সন্তান ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়, তাকেও একদিন বৃদ্ধাশ্রমের নিঃসঙ্গতায় গিয়ে, ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর।

 

……………………………..

Saturday, January 7, 2023

সমাজচিন্তক বিদ্যাসাগর: একুশ শতকের চোখে - প্রফেসর উৎপল মণ্ডল

 





সমাজচিন্তক বিদ্যাসাগরঃ একুশ শতকের চোখে : প্রফেসর উৎপল মণ্ডল

ড. উৎপল মণ্ডল 
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 
utpalnbu@yahoo.com 
 

আজ এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগরের মতন একজন মানুষকে ঠিকঠাক ভাবে অনুধাবন করতে গেলে উনিশ শতকের প্রথমার্ধকে—যা বাঙালির কাছে এক জটিল ঘূর্ণাবর্তের কাল; নানামুখী চিন্তাভাবনার দ্বন্দ্ব সংঘাত—সেই সময়টিকে ভালো করে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে দুটি কারণে। প্রথমত, এই সময় বাঙালী জীবনে এসে লেগেছে নবজাগরণের ঢেউ, যদিও তা মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক। দ্বিতীয়ত, পড়াশোনা সূত্রেই বিদ্যাসাগর কলকাতায় এবং তাঁর মানসিক গঠনটি তৈরি হচ্ছে এই প্রেক্ষাপটেই। Read More

Sunday, August 14, 2022

অতুলপ্রসাদের গান: স্বদেশ ও স্বপ্ন

 


অতুলপ্রসাদের গান: স্বদেশ ও স্বপ্ন || Prof. Utpal Mandal

Sunday, May 8, 2022

কলকাতা আর উলাপুর : 'পোস্টমাস্টার ' এর সমাজ মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত

কলকাতা আর উলাপুর : 'পোস্টমাস্টার ' এর সমাজ মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত


কবি প্রণাম, উৎপল মন্ডল




উৎপল মণ্ডল, প্রফেসর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়:

এই একুশ শতকের দুটি দশক পার করে এসে রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার গল্প নিয়ে কিছু লেখা খুব কঠিন বলেই আমার মনে হয়। কারণ, প্রথমত, বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, এতই হয়েছে যে সেই মহারণ্যে পথ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা প্রবল। আর দ্বিতীয়ত, গল্পের আবেদন গত দিক।  বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন